Saturday, 6 January 2018

ভ্রান্তিবিলাস – এ যুগে

আচ্ছা দু-জন মানুষের কি এক চেহারা হতে পারে? আমি যমজ ভাই বোনদের কথা বলছিনা। আমি বলছি দু’টি সম্পূর্ণ অপরিচিত ও অনাত্মীয় মানুষের কথা। আমরা যে সব কাহিনী টিভিতে বা সিনেমায় দেখি, - এই যেমন, উত্তম কুমারের ঝিন্দের বন্দী বা দেব আনন্দের হম দোনো। অদ্ভূত ব্যাপার, তাই না? এ সব ঘটনা বাস্তব জীবনে কখনও ঘটে না বলেই সবার ধারণা। কিন্তু আমার জীবনে কিছু ঘটনা ঘটেছে যাতে আমার মনে হয় আমার মত চেহারার এক বা একাধিক লোক এই শহরেই আছে।

প্রথম থেকেই বলি।

আজ থেকে বছর ষাটেক আগের কথা। আমি তখন স্কুলে। বয়স ১০ বা ১২। আসামে থাকতাম। বাবার চাকরি ছিল সেখানেই। আমার ও আমার ছোট বোনের পূজোর ছুটি শুরু হলে বাবাও ছুটি নিতেন। আমরা সপরিবারে কলকাতায় চলে আসতাম। এসে উঠতাম রাজাবাজারে আমার কাকার বাড়ি। সেখানে ক’দিন কাটিয়ে বালিগঞ্জের ফার্ন রোডে আমার বড়ো পিসীমার বাড়ি। তারপর ক’দিন পর চুঁচুড়ায়, - আমার জন্মস্থান ও মাতুলালয়। সেখানে খুব ধুমধাম করে পূজো হত। পূজো শেষ হলে আবার কলকাতায়। আবার বড়ো পিসীমার বাড়ি, কাকার বাড়ি হয়ে ফেরত।

পিসীমার সহকারী ছিলেন হরিকাকা। হরিকাকা বহুদিন ধরে পিসীমার পরিবারে। তিনি সবার হরিকাকা। পিসেমশায়, আমার পিস্তুতো দাদা ও দিদি, আমার মা ও বাবা ও আমাদেরও তিনি হরিকাকা। তাঁর বয়স কেউ জানত না, একটু ন্যুব্জ, কৃষ্ণবর্ণ, শীর্ণকায় চেহারা। তাঁর তত্ত্বাবধানে আমার  বাড়ির বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল। একদিন সকালে আমি হরিকাকার সঙ্গে বাজারে গেছি। ঘুরে বেড়াচ্ছি, হরিকাকার শক্ত হাতে আমার হাত। এমন সময়, সম্পূর্ণ অপরিচিত এক বয়স্ক ভদ্রলোক, ফর্সা, লম্বা দোহারা চেহারা, পরনে ধবধবে ধুতি ও পাঞ্জাবী, আমায় দেখে একগাল হেসে বললেন ,- একি? তোমরা কলকাতায়? কবে এসেছো? মা, বাবা, বোন সবাই এসেছেন নিশ্চয়ই। আমি বরাবরই একটু লাজুক প্রকৃতির। অচেনা  লোক দেখে বাক্যিহারা হয়ে যাই, মাথা নেড়ে সায় দিলাম। ভদ্রলোকের আবার প্রশ্ন, - কেমন লাগছে কলকাতা? আমি মিনমিন করে বললাম, - ভাল লাগছে। এর পরের প্রশ্নে আমি একেবারে দিশাহারা। উনি জিজ্ঞেস করলেন, - দিল্লী থেকেও ভাল? দিল্লীতে আমার এক মাসী থাকতেন, সেখানে একবার যাওয়ার কথাবার্তা চলছিল কিন্তু যাওয়া হয়নি। আমি কিছুই বললাম না। ভদ্রলোক আবার বললেন, - কি? দিল্লী ভাল না কলকাতা ভাল? আমি মিনমিন করে বললাম, - কলকাতা। ভদ্রলোক খুশি হয়ে থুতনি ধরে আদর করে চলে গেলেন। এর পর অবশ্য ওনার সঙ্গে দেখা হয়নি। উনি নিশ্চয়ই অন্য কারও সঙ্গে আমাকে গুলিয়েছিলেন।

পরবর্তী ঘটনা ঘটে অনেক দিন পরে। আশির দশকের প্রথম দিকে। বাবা কাজ থেকে অবসর নিয়ে তখন কলকাতায়। আমি সদ্য চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছি এক বছর আগে। প্রথম ছুটিতে দেশে ফিরেছি। খুব ফুরফুরে মেজাজে। কলকাতা পৌঁছেই বন্ধুবান্ধবদের ফোন করে যোগাযোগ করছি। প্রথম ফোন করলাম দেবু মানে দেবরাজের বাড়ি। ফোন ধরল রত্না, দেবুর স্ত্রী। দেবুর মা হাসপাতালে। দেবু ছুটি নিয়েছে। ডাক্তার, বদ্যি, ওষুধ-পত্র নিয়ে খুব ব্যস্ত। রত্না জানাল দেবুর বাড়ি আসার কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। তবে ভিজিটিং আওয়ারে হাসপাতালে গেলে দেখা হবে। রত্না জানিয়ে রাখবে আমার কথা। মনটা খারাপ হয়ে গেল। মাসীমা খুব স্নেহশীলা। ছাত্রজীবনে অনেকবার দেবুর বাড়ির ছাদে আড্ডা মেরেছি। মাসীমা দফায় দফায় চা, জলখাবার পাঠাতেন।

ভাবলাম হাসপাতালে একা না গিয়ে আরও কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাই। অনিন্দ্যকে ফোন করলাম। অনিন্দ্য ব্যস্ত মানুষ। এক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। কম বয়সে খুব উন্নতি করেছে। শহরের কয়েকটি তথাকথিত অভিজাত ক্লাবের সদস্য, গলফ-টলফ খেলে। পরের দিন রবিবার। অনিন্দ্য জানালো বিকেলের দিকে আমরা হাসপাতালে যাবো একসঙ্গে। ওকে ওর ক্লাব থেকে তুলে নিতে হবে, ওর ব্রিজ ম্যাচ আছে। ওর গাড়ি থাকবে না। গাড়ি নিয়ে শ্বেতা, মানে ওর স্ত্রী, বন্ধুদের নিয়ে শপিং-এ যাবে।

পরের দিন বিকেলের দিকে একটি গাড়ি ভাড়া করে আমি অনিন্দ্যর ক্লাবে পৌঁছলাম। অনিন্দ্যের নির্দেশ মত ক্লাবের রিসেপশনে গিয়ে ওর নাম বললাম। সেকালে তো আর মোবাইল ফোন ছিলনা। রিসেপশনের ভদ্রলোক আমায় বসতে বললেন। সামনে কয়েকটি সোফা সাজানো ছিল, - গিয়ে বসলাম। হঠাৎ দেখি বছর পঁচিশের একটি ছেলে, গলায় টাই, বোধহয় ঐ ক্লাবেরই কর্মচারী, আমায় দেখে বলল, - গুড আফটারনুন। স্যর আপনি? আমি একটু ফ্যালফ্যাল করে তাকাতে আবার প্রশ্ন, - অনেক দিন পর আপনাকে দেখলাম স্যর। আপনি কি এখন এখানে থাকেন না? আমি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমার স্মৃতি হাতরে যাচ্ছি, কিন্তু কিছুতেই কুল কিনারা পাচ্ছি না। মিনমিন করে জানালাম, - না এখন বাইরে থাকি। ছেলেটি একগাল হেসে বলল, - তাই আপনাকে আজকাল ক্লাবে দেখিনা। আমি ব্যাপারটা পরিষ্কার করার আগেই অনিন্দ্য পৌঁছে গেল। ছেলেটি অনিন্দ্যকেও গুড আফটারনুন জানালো। অনিন্দ্য একটু মৃদু হেসে আমাকে বলল, - চল রওনা হই।

গাড়িতে উঠে অনিন্দ্যকে বললাম। কোনও গুরুত্ব না দিয়ে বলল, - অন্য কারও সঙ্গে গোলমাল করেছে বোধহয়। যা নন-ডেসক্রিপটিভ চেহারা তোর!

যাক, সংক্ষেপে বলি মাসীমা মানে দেবুর মা সে যাত্রা সেরে উঠেছিলেন।

এবার তৃতীয় ঘটনা।

বছর পাঁচেক আগে কাজ থেকে অবসর নিয়ে কলকাতায় ফিরেছি। গিন্নীকে যথা সম্ভব সাহায্য করছি নতুন সংসার সাজিয়ে নিতে। সাংসারিক ব্যাপারে আমার কোনও রকম সুনাম নেই। যাই হোক, একদিন গিন্নীর দেওয়া লিস্ট পকেটে নিয়ে বাজারে বেরোলাম। আবাসনের পাশে আধুনিক শপিং মল। সেখানে বিশাল এক সুপার মার্কেট। কেনা কাটা করে বিল মেটাতে ডেবিট কার্ড বের করলাম। বিল হয়েছে ৮৩৮ টাকা। পেমেন্ট কাউন্টারের ছেলেটি কার্ড ঢুকিয়ে কি টেপাটেপি করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, - এরর মেসেজ আসছে স্যর। আমি দ্বিতীয় বার চেষ্টা করতে বললাম। এবার কোনও গোলমাল হলনা। বিল পকেটে ঢুকিয়ে ব্যাগ হাতে নেবার সঙ্গে সঙ্গে আমার পকেটে মোবাইল ফোন দু-বার কুঁক কুঁক করে উঠল, - বের করে দেখি ব্যাংক থেকে এসএমএস এসেছে, - ৮৩৮ টাকা দু-বার ডেবিট হয়ে গেছে। আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে ছেলেটিকে দেখালাম। ছেলেটির তো কাঁদো কাঁদো অবস্থা, - স্যর আপনার সামনেই তো এরর মেসেজ এসেছিল, আপনাকে তো দেখালাম। শেষ অব্দি ছেলেটিই বলল, - ম্যানেজারের কাছে যাই চলুন।

একটি মাঝারি আকারের সুসজ্জিত অফিস ঘরে ম্যানেজার আসীন। মহিলা বেশ আকর্ষণীয়া; বছর পঞ্চাশের মত বয়স। এককালে নিশ্চয়ই খুব সুন্দরী ছিলেন। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন, - স্যর আপনি? বুঝলাম আবার সেই ভ্রান্তিবিলাস। ভদ্রমহিলা এক নাগারে বলে যাচ্ছেন – আমাকে চিনতে পারছেন না স্যর, আমি সেই যে মিউজিকাল ওয়ার্লডে ছিলাম। পার্ক স্ট্রীটে। আপনি ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল রেকর্ড কিনতে আসতেন। নতুন কিছু এলে আমি আপনাকে ফোন করে খবর দিতাম...। পার্ক স্ট্রীটের মিউজিকাল ওয়ার্লডে আমি এক আধবার গেছি পুরনো দিনের বাংলা ও হিন্দী গানের সিডি কিনতে। পাশ্চাত্য ধ্রূপদী সঙ্গীত আমি কস্মিন কালেও শুনিনি।  আমি একটু দেঁতো হাসলাম। মনে মনে ভাবলাম এনার সাহায্য যখন দরকার তবে আমার আসল পরিচয় না দেওয়াই ভাল।

ভদ্রমহিলা আমাকে দেখে এত খুশি হয়েছিলেন যে সমস্যার সমাধান খুব তাড়াতাড়িই হয়ে গেল। আমাকে সযত্নে বসিয়ে চায়ের অর্ডার দিয়ে উনি বেশ কয়েকটা ফোন করলেন এদিন ওদিক। তিন দিন পর ৮৩৮ টাকা আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে গেল।

এখনও সেই সুপার মার্কেটে গেলে আমার সঙ্গে দেখা হয় মহিলার। আমি খুব ব্যস্ততার ভান করে পাশ কাটিয়ে সরে যাই।

এর পরের ঘটনা গত পূজোর সময়কার।

অষ্টমীর দিন সকালে কয়েক জন প্রবীণ নাগরিক কলকাতা শহরে বনেদি বাড়ির পূজো দেখতে বেরিয়েছিলাম। সবাই আমাদের আবাসনের। কয়েকটি অচেনা মুখও দেখলাম। আলাপ পরিচয় করে জানতে পারলাম এঁরা কলকাতায় থাকেননা। এঁদের ফ্ল্যাট বন্ধ থাকে। মাঝে মাঝে এখানে এসে ছুটি কাটিয়ে যান। সারা দিন ঘুরে ঘুরে খুব ক্লান্ত হয়ে যখন ফিরে আসছি, আবাসনের কাছাকাছি এসে, আমাদের পাশের সীটে বসা দম্পতীর সঙ্গে আলাপ হল। বছর ষাটেক বয়স। প্রেসিডেন্সীতে সহপাঠি ছিলেন। এক সঙ্গে আমেরিকা গিয়েছিলেন পিএইচডি করতে। এখন দু-জনেই আমেরিকার একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। বিষয় অর্থনীতি। দুই ছেলে সেদেশেই সুপ্রতিষ্ঠিত।

ওনাদের পরিচয় নিয়ে আমি বললাম, - আচ্ছা এবার আমার পরিচয় দিচ্ছি। তাতে ওঁদের প্রতিক্রিয়া দেখে ও শুনে আমার ভির্মি খাওয়ার মত অবস্থা। দুজনেই হাতজোড় করে সসম্ভ্রমে বলে উঠলেন, - লজ্জা দেবেন না স্যর, আপনাকে কে না চেনে, - কত অনুষ্ঠানে গান শুনেছি আপনার। আমার তখন হেঁচকি টেচকি উঠে ভয়ঙ্কর অবস্থা। ভাবলাম এ রকম ভাবে চলতে পারেনা। আসল পরিচয় দিয়ে দেওয়া উচিৎ , এবং এখনই। কিন্তু সেই সময়েই আমাদের গাইড বলে উঠলেন আপনাদের বাড়ি পৌঁছে গেছি, এবার আস্তে আস্তে নেমে যান। আমি সামলে উঠে কিছু বলার আগেই ওঁরা বাস থেকে নেমে গেলেন। আমার সঠিক পরিচয় আর দেওয়া হলনা।

পরে খোঁজ খবর করেছিলাম। শুনলাম ওঁরা আমেরিকায় ফিরে গেছেন। সামনের বছর এলেই ওঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আসল পরিচয়টা দিতে হবে নইলে বিবেকের দংশনেই জ্বলে পুড়ে মরব।

আপনারা যারা আমাকে চেনেন তাঁদের অনুরোধ যদি আমার মত দেখতে কারও সঙ্গে আলাপ হয় যিনি শহরের কোনও অভিজাত ক্লাবের সদস্য, ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল সঙ্গীতের ভক্ত, সুগায়ক এবং ছোটবেলায় দিল্লীতে ছিলেন, তবে দয়া করে আমাকে জানাবেন।

শুভেচ্ছা রইল।

কলকাতা ৬ই জানুয়ারি ২০১৮ 


Monday, 5 June 2017

আতাতুর্কের দেশে



যাত্রা হল শুরু
মুম্বাই থেকে বাহরেইন হয়ে গালফ এয়ারলাইন্সের প্লেন যখন ইস্তানবুল এয়ারপোর্টে এসে নামল, তখন সকাল প্রায় দশটা চড়া রোদ উঁকি মারছে প্লেনের জানলা দিয়ে ক্লান্ত লাগছে খুব আগের দিন বিকেলে বেরিয়েছি কলকাতা থেকে, ইন্ডিগোর ফ্লাইটে মুম্বাই পৌঁছেছি  রাত আটটায়,- তারপর ছত্রপতি শিবাজী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের কেঠো চেয়ারে সারা রাত অপেক্ষা। ইস্তানবুলের প্লেন ছাড়ল ভোর সারে ছটায়। প্লেন থেকে নামার সময় মনে হচ্ছিল শরীর আর চলছে না।

ইস্তানবুল আতাতুর্ক বিমান বন্দর তুরস্কের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ত বিমান বন্দর। বেশ বড়, কিন্তু দুবাই বা সিঙ্গাপুরের মত অত ঝকঝকে বা বিলাস বহুল নয়। ভিসা আগেই করা ছিল। ইমিগ্রেশনে বেশি সময় লাগল না। অনেকগুলো কাউন্টার। এক অতি সুদর্শণ যুবক কাগজ পত্র দেখে খুব গম্ভীর মুখে পাসপোর্টে স্ট্যাম্প মেরে দিলেন। আমি ভদ্রতার খাতিরে গুড মর্নিং, থ্যাঙ্ক ইউ ইত্যাদি বললাম কিন্তু কোনও সাড়া পেলাম না। মনে হল কি জানি বাবা, এখানকার লোক বোধহয় এরকমই গোমড়ামুখো। পরে অবশ্য ধারণা পালটে গিয়েছিল। তুরস্কের লোকজন খুবই অমায়িক ও বন্ধুসুলভ। সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি।

দশ জনের দল আমাদের। সবাই আমাদের আবাসনেরই বাসিন্দা এবং প্রবীন নাগরিক। প্রত্যেকের একটি করে মাঝারি সাইজের ব্যাগ। মালপত্র নিয়ে কাস্টমস ছাড়িয়ে বেরিয়ে দেখলাম দুটি কমবয়সী ছেলে হাতে বিরাট প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাতে বেশ স্পষ্ট হরফে বড় বড় করে লেখা টমাস কুক ওয়েলকামস দ্য গ্রুপ ফ্রম কোলকাট্টা (ইংরিজিতে লেখা বানান Kolkatta), - কবে যে লোকে আমাদের শহরের নামটা শুদ্ধ ভাবে লিখতে বা বলতে পারবে

ছেলে দুটি সাদর অভ্যর্থনা জানাল আমাদের একটি ভারতীয়, - নাম বলল সুর্জিৎ (সুরজিৎ), এখানেই থাকে স্ত্রী কন্যা থাকে দিল্লীতে দ্বিতীয় ছেলেটি স্থানীয়, - নাম ওসগুর, যে রকম ভাবে নামটা উচ্চারণ করল, - মনে হল পেটের ভেতর থেকে আর গলার গভীরতম জায়গা থেকে বেরোচ্ছে আমরা সবাই বার কয়েক চেষ্টা করে রণে ভঙ্গ দিলাম ওকে জানিয়ে দিলাম, - তোমায় ভাই আমরা অস্কার বলে ডাকবো ছেলেটি সহাস্যে রাজি হল।

সুরজিৎ জানালো আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে কারণ দিল্লী থেকে আরেকটা ফ্লাইটে আরও ছজন আসছেন ওঁরাও আমাদের দলে, দিল্লী থেকে বুক করেছেন অগত্যা এয়ার পোর্টে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই ঘন্টা খানেক পর দিল্লীবাসীদের সঙ্গে আমরা রওনা হলাম শহরের দিকে সুন্দর আরামদায়ক বাস, সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত

ইস্তানবুল – অতীত ও বর্তমান
সুরজিৎ ও অস্কার আমাদের গাইড প্রথমে সুরজিৎ, তারপর অস্কার মাইক হাতে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল এই ঐতিহাসিক শহরের সঙ্গে এশিয়া ও ইউরোপ, দুটি মহাদেশে বিস্তৃত এই শহরের মোট জনসংখ্যা এখন প্রায় দেড় কোটি। ঝকঝকে, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তায় ছুটে চলেছি শহরের দিকে। ডুয়েল ক্যারেজওয়েরর মাঝখানের ডিভাইডারে সুন্দর ফুলের বাগান। সেই ফুল কেউ ছেঁড়ে না। শহরের সৌন্দর্যের ব্যাপারে নগরিকেরা খুব সচেতন।

রাস্তার ডিভাইডারে ফুলের বাগান

ইস্তানবুলের বর্তমান আধুনিক চেহারা দেখলে কে বলবে যে এই শহরেই রোম সম্রাট কনস্টানটাইন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর রাজধানী, - কনস্টানটিনোপোল, ৩৩০ খৃষ্টাব্দে। অস্কার জানালো, এই শহরের ইতিহাস আরও পুরনো। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় জানা গেছে যে  তিন হাজার বছর আগেও এখানে এক প্রাচীন উপজাতির বসবাস ছিল। সেই সময়ের এর নাম ছিল লাইগস। পরবর্তী কালে গ্রীক সাম্রাজ্যের অধীনে আসে এই শহর, নাম দেওয়া হয় বাইজান্টিয়াম। অত্যন্তঃ জটিল এই ইতিহাসের খুঁটিনাটি। আমরা খেই হারিয়ে ফেললাম। শুধু এইটুকু জানলাম যে পরবর্তী কালে এই শহর অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে ও ঘোষিত হয় সাম্রাজ্যের রাজধানী। নাম হয় ইস্তানবুল। তবে ১৯২৩ খৃষ্টাব্দে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর রাজধানী স্থানান্তরিত হয় আঙ্কারা শহরে। ইস্তানবুল হারায় তার রাজনৈতিক গড়িমা। তবে এখনও এই শহরের বানিজ্যিক, ব্যবসায়িক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এখনও অক্ষুন্ন।

এই দেশের লোকেরা নিজেদের দেশকে বলে তুর্কিয়া। ইংরিজিতে বলে টার্কি। আমরা কেন তুরস্ক বলি সেই রহস্য ভেদ হলনা। আমাদের গাইড দু’জনও এ ব্যাপারের কোনও আলোকপাত করতে পারল না। দিল্লীবাসী আমাদের সহযাত্রীরাও জানালেন তুরস্ক শব্দ ওঁদের অপরিচিত। যাই হোক, এ নিয়ে আলোচনা আরেক দিন করা যাবে।
তুরস্কবাসীদের আচার ব্যবহার, চেহারা, পোষাক আষাক সম্পূর্ণ পাশ্চাত্যমুখী। নারী ও পুরুষ গতানুতিক পশ্চিমী জামা কাপড়েই সচ্ছন্দ্য। কিন্তু এঁরা ধর্মপ্রাণ মুসলিম। এক’শ বছর আগেও এঁরা ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম খিলাফতের নাগরিক।

রাস্তার দু-ধারে একটু পর পরই চোখে পড়ে নানা আকারের মসজিদ। মসজিদের স্থাপত্য আমাদের পরিচিত স্থাপত্য থেকে একটু আলাদা। মসজিদের সামনে সুন্দর বাগান ও গাড়ি পার্ক করার সুব্যবস্থা। এখানে বলে রাখা ভাল যে তুর্কি স্থাপত্যের জগৎ জোড়া খ্যাতি ছিল এক কালে। ভারত ও উপমহাদেশের বহু শহরেও তার নিদর্শন রয়েছে।

মসজিদের স্থাপত্য একটু স্বতন্ত্র
রাস্তায় বেশ ভীড়। বুধবার, - কাজের দিন। শহরের কাছে এসে বাসের গতি কমে এলো। বেশ ট্র্যাফিক। অবশেষে পৌঁছোলাম হোটেলে। এখন কিছুক্ষণ বিশ্রাম ও স্নানাহার। হোটেলটি ইস্তানবুল শহরের কেন্দ্রেই। আশেপাশে অনেক দোকানপাট আর রেস্তোরাঁ।

বিকেলের দিকে মনে হল নতুন দেশে এসেছি যখন, হোটেলে বসে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। বেরিয়ে পড়লাম সদলবলে। দিল্লীবাসীরাও সাগ্রহে রাজি হলেন। আমাদের গাইডদ্বয়ও দেখলাম খুব উৎসাহী। যে বাসে করে এয়ারপোর্ট থেকে এসেছিলাম, সেই বাসটি হোটেলের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। এটিই এখন আমাদের বাহন। বাসে উঠে বসলাম সবাই। ঘুরে ঘুরে দেখলাম শহরটা, যতটা সম্ভব।

ইস্তানবুলের এক তৃতীয়াংশ লোক বাস করেন এশিয় অঞ্চলেবাণিজ্যিক কর্মকান্ড কিন্তু ইউরোপিয়ন অঞ্চলেই বেশিএশিয় অঞ্চল থেকে প্রচুর লোক প্রত্যেক দিন ইউরোপিও অঞ্চলে আসেন পেশাগত কারণে। এশিয়া আর ইউরোপিও অঞ্চলের মাঝখানে বয়ে চলেছে বসফরাস প্রণালী (Bosphorus Strait) স্বচ্ছ, পরিস্কার, টলটলে জলরাশি দেখলেই বোঝা যায়, এই প্রণালী খুব সযত্নে লালিত। জলে ভাসছে প্রচুর ছোট ও মাঝারি আকারের স্টীমার। তাতে রয়েছে লাঞ্চ, স্ন্যাক্স ও ডিনারের ব্যবস্থা। পর্যটকদের কাছে জায়গাটি খুব প্রিয়।

বসফরাস প্রণালী

আমাদের প্রশ্নের জবাবে অস্কার জানালো যে বসফরাস প্রণালীর একপ্রান্তে কৃষ্ণ সাগর (Black Sea) আর অন্য প্রান্তে মার্মারা সাগর (Sea of Marmara) এই সাগরেই অবস্থিত মার্মারা দ্বীপ, সেই নামেই সাগরের নাম এই দ্বীপেরমার্বেলজগদ্বিখ্যাত এবং মার্বেলের জন্যেই দ্বীপের নাম মার্মারা; - ওদের ভাষায় মার্বেলকে বলে মার্মারা! কি আশ্চর্য তাই না? মর্মরের সঙ্গে মার্মারার কি অদ্ভুত মিলতবে কি কোনও এক প্রাচীন যুগে সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক লেনদেন ছিল আমাদের দুই দেশের মধ্যে? তখনই কি আমাদের দেশবাসীরা এই দেশের নাম রেখেছিলেন তুরস্ক?

ইউরোপিয় অংশের বাণিজ্যিক অঞ্চল গমগম করছে পড়ন্ত বিকেলে। রাস্তার দু-পাশে অসংখ্য দোকানপাট, পর্যটকদের ভীড়ই বেশি। নানা রকম পণ্যতুরস্ক বেশ শিল্পোন্নত দেশ। এদের চর্ম ও বস্ত্র শিল্প পৃথিবী বিখ্যাত। আমাদের দলের মহিলারা সাগ্রহে ঢুকে গেলেন বিভিন্ন দোকানে। শুরু হল দরদাম। দোকানদারেরাও দেখলাম সাদরে নিমন্ত্রণ জানালেন সম্ভাব্য ক্রেতাদের।
 
রাস্তার দু-ধারে দোকান ও রেস্তোরাঁ
প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা এইটুকুই। সন্ধ্যের পর সবাই দেখলাম খুব ক্লান্ত ও অবসন্ন। একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম সবাই। বিছানায় পড়া মাত্রই গভীর নিদ্রা।

প্রাচীন স্থাপত্য
দ্বিতীয় দিন সকালে হোটেলে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার উঠলাম বাসে। সুরজিৎ আর অস্কারও দেখলাম তৈরী। আজ আমাদের প্রথম গন্তব্য স্থল হল সুলতান আহমেদ মসজিদ। সারা বিশ্বে এই মসজিদ “ব্লু মস্ক” বা নীল মসজিদ নামে পরিচিত। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নির্মিত এই মসজিদ এক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পর্যটন কেন্দ্র। এর ভেতরে ও বাইরের সাজ সজ্জা ও অলঙ্করণ থেকে এক নীলাভ দীপ্তি ভেসে আসে। সেই থেকেই এর নাম। ভেতর ও বাইরের সব সুক্ষ্ম কারুকার্য কিন্তু পুরোটা হাতে করা। এই মসজিদের আরও একটি বৈশিষ্ট হল এর ছ’টি মিনার, পাঁচটি বিশাল গম্বুজ ও আরও আটটি অপেক্ষাকৃত ছোট গম্বুজ। দুর্ভাগ্য যে ক্যামেরায় ছ’টি মিনারের ছবি ফ্রেমে আনতে পারলাম না। তাই বাধ্য হয়ে পিকচার পোস্টকার্ড থেকে একটি ছবি দিলাম। অনন্য এর স্থাপত্য। ভেতরে চারদিকের দেওয়ালে অপূর্ব ক্যালিগ্রাফি। এই বিশেষ স্থানটি একটি ধর্মীয় সৌহার্দেরও প্রতিক। ২০০৬ সালে পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট এখানে এসেছিলেন অতিথি হিসেবে। সঙ্গে ছিলেন এই মসজিদের ইমাম। দু-জনে এক সঙ্গে প্রার্থনা করেন এই ঐতিহাসিক মসজিদে।
   
নীল মসজিদ                                ছ’টি মিনার
Related image 
মসজিদের ভেতরে সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম            ছাদ বা সিলিং-এ অপূর্ব ক্যালিগ্রাফি

নীল মসজিদ থেকে হাঁটা পথে পৌঁছলাম আয়া সোফিয়া (তুর্কী উচ্চারণ) বা হ্যাগিয়া সোফায়া (Hagia Sophia)এই ঐতিহাসিক নীল মসজিদ থেকে অন্ততঃ এক হাজার বছর আগে নির্মিত। যাঁরা আধুনিক ইংরিজি সাহিত্য নিয়ে একটু আধটু চর্চা করেন তাঁরা নিশ্চয়ই “দা ভিঞ্চি কোড” খ্যাত লেখক ড্যান ব্রাউনের “ইনফার্নো” পড়েছেন। সেই বইটিতে এই ভবনটির খুব বিশদ বর্ণনা দেওয়া রয়েছে। এর একটি বৈশিষ্ট হল যে এটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মতবাদের ধর্ম চর্চার জায়গা ছিল। আমাদের গাইড অস্কারের কাছে শুনলাম যে প্রাগৈতিহাসিক যুগে এখানে মূর্তি পূজার প্রচলন ছিল। পরে গ্রীক আমলে এখানে নতুন করে এক বিরাট গির্জা নির্মিত হয়, গ্রীক অরথোডক্স মতালম্বীদের তত্ত্বাবধানে। পরে কোনও এক সময়ে এটি রোমান ক্যাথলিকদের নিয়ন্ত্রনে আসে। পরবর্তী কালে যখন এই অঞ্চল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে, তখন এটি একটি মসজিদে রূপান্তরিত হয়। আয়া সোফিয়ার স্থাপত্য শিল্প কিন্তু নীল মসজিদের কাছাকাছিও আসে না। দেখে কেমন যেন মনে হয় যে এটি বেশ জোড়াতালি দিয়ে বানানো হয়েছে। আমাদের মত অনভিজ্ঞ চোখেও ধরা পড়ে যে এর চারটি মিনার আলাদা ভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল মসজিদের ঐতিহ্য অনুযায়ী। এখন অবশ্য এটি আর মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। এটি এখন একটি মিউজিয়াম বা সংগ্রহশালা। নানা রকম অমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ভেতরের দেওয়ালে এখনও রয়ে গেছে খ্রীস্টান ও ইসলামি সভ্যতার নানা কালজয়ী নিদর্শন।
আয়া সোফিয়া – মিনার গুলো পরে বসানো হয়েছে।

তুরস্কের ইতিহাসে অটোমান সাম্রাজ্য বা খিলাফতের প্রসঙ্গ আসবেই। এই “অটোমান” শব্দটির সম্বন্ধে কিছু  তথ্য জানাই এবারএই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ওসমান গাজী বা প্রথম ওসমান। তাঁর নামেই এই বংশ বা সাম্রাজ্যের নাম। ব্যাকরণ-গত কারণে আরবরা ওসমান শব্দটির উচ্চারণ করেন ওথমান বা উথমান। এ রকম উদাহরণ প্রচুর আছে। যেমন আরবরা রমজানকে বলেন রামাদান বা আজানকে বলেন আদান। এই ওথমান বা উথমান থেকেই ইংরিজি ভাষায় অটোমান শব্দের উৎপত্তি। যেহেতু আমরা এই অঞ্চলের ইতিহাস শিখেছি ইংরেজদের কাছে, আমরাও এই অটোমান শব্দটি ব্যবহার করি। নিয়ম মত আমাদের কিন্তু ওসমান সাম্রাজ্যই বলা উচিৎ। কালক্রমে এই সাম্রাজ্যের বিরাট বিস্তৃতি ঘটে এবং এই বংশের সুলতানরা খলিফা বা আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পান মুসলিম জগতে। ১৯২৪ সালে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে ওসমান বা অটোমান সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।

বাজার হাট - সংক্ষেপে শপিং
ইতিহাস সমৃদ্ধ যে কোনও দেশ বা শহরে অজস্র সংগ্রহশালা বা মিউজিয়াম দেখা যায়। গাইডরাও খুব উৎসাহের সঙ্গে সেখানে পর্যটকদের নিয়ে যান। কিন্তু যাঁদের ইতিহাসে সচেতনতা কম তাঁরা কিছুক্ষণ পরে অধৈর্য হয়ে পড়েন। তাই কয়েকজনের আগ্রহ সত্ত্বেও আমাদের দলের গরিষ্ঠ সংখ্যক সদস্যের ইচ্ছেয় আমাদের গাইড বন্ধুরা আমাদের নিয়ে গেলেন এক বিশেষ আকর্ষনীয় জায়গায়। ইস্তানবুলের বিখ্যাত গ্র্যান্ড বাজারেএই বাজারের খ্যাতি জগৎ জোড়া। অস্কারের কাছে জানলাম যে প্রতি বছর নয় থেকে দশ কোটি লোক এখানে বাজার করেন। এই বাজারের আদলটা অনেকটা কলকাতার নিউ মার্কেটের মত, কিন্তু বিশাল। এ বাজার বহু পুরনো, পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে চলছে রমরমিয়ে। হেন জিনিষ নেই যা এখানে পাওয়া যায় না। তুর্কীরা গর্ব করে বলে, - এটা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন শপিং মল। কথাটা খুব একটা মিথ্যে নয়

সাহস করে একটা কথা বলেই ফেলি। এখানে ঢোকার পর দেখলাম মহিলাদের মুখ চোখ কেমন চকচক করে উঠল। কিন্তু তাঁদের কর্তারা কেমন যেন বিষন্ন হয়ে গেলেনআমাদের এক বন্ধু তো আমার কানে ফিসফিস করে বলেই ফেললেন, - এবার হল, এখান থেকে কখন বেরোতে পারব তা ঈশ্বরই জানেন। দিল্লীবাসী এক সহযাত্রী বেশ সশব্দেই তাঁর ধরমপত্নীকে বললেন, - সুনো জি, ফজুলকী চীজ মত খরিদ না। কিন্তু সেই আবেদন মহিলাটির কানে পৌঁছল বলে মনে হল না।

মহিলারা নানা দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন দোকানে ঢুকে গেলেন। সবার কাছেই কিছু তুর্কী মুদ্রা বা লিরা রয়েছে। এক তুর্কী লিরা আমাদের মুদ্রায় ২০ টাকার কাছাকাছ। ইউরোও চলে। শুরু হল শপিং। এখানে দেখলাম সবাই মোটামুটি ইংরিজি জানে। যথা সময় মহিলারা জানালেন এখানে সব কিছু নাকি খুব সস্তা। সেই শুনে কর্তারা প্রমাদ গুনলেন। অস্কার ও সুরজিৎ দু-জনেই সাবধান করে দিয়েছিল যে এখানে প্রচন্ড দরাদরি করতে হয়। কিন্তু কতটা দরাদরি করতে হয় তা আমি টের পেলাম একটু পরে। আগেই বলেছি এখানকার চর্মশিল্প খুব বিখ্যাত। এক দোকানদার একটি চামড়ার টুপি হাতে নিয়ে আমার পেছনে পড়ল। টেক স্যর ভেরি গুড স্যর করতে করতে আমার পিছু নিল। আমি টুপি পরি না; কাউকে পরানোর ইচ্ছেও আমার নেই। কিন্তু লোকটি নাছোড়বান্দা। ওর হাত থেকে বাঁচবার জন্য দাম জিজ্ঞেস করলাম, - বলল ওনলি হান্ড্রেড লিরা মানে আমাদের হিসেবে প্রায় দু-হাজার টাকা। আমি বললাম, - টু মাচ। লোকটি নিরাশ হল না, জিজ্ঞেস করল, - হাও মাচ ইউ পে? আমি ওকে কাটানোর জন্য বললাম, - পঁচিশ লিরা। লোকটা বিষন্ন মুখে বলল, - আই মেক বিগ লস। বাট ইউ মাই গেস্ট। আই গিভ ফর টুয়েন্টি ফাইভ। লোকটি আমার হাতে টুপিটা গুঁজে দিল। আমি বোকার মত পঁচিশ লিরা বের করে দিলাম। আমাকে টুপি পরানো যে এত সোজা আগে বুঝিনি কখনও

যাই হোক, অবশেষে গাইড দু’জনের তাড়ায় মহিলারা বাজারে ক্ষান্ত দিলেন। আমরাও কিচ্ছু জামা কাপড় কিনলাম, নাতি নাত্নীদের জন্য। আমাদের জন্য আর কিই বা নেব? আর দু-বাক্স টার্কিশ ডিলাইট কিনলাম। হালুয়া জাতীয় এই তুর্কী মিষ্টির স্বাদ অতুলনীয়; স্বর্গীয়।
 
              ইস্তানবুলের গ্র্যান্ড বাজার               নানা রকমের পসরা সজানো

এক ভারতীয় রেস্তোরাঁয় ডিনার সেরে হোটেলে ফিরতে বেশ রাতই হল।

রাজকীয় আঙ্কারা
তৃতীয় দিন। সকাল বেলা উঠেই ব্যাগ বাক্স গুছিয়ে ফেলতে হল। আজ ইস্তানবুলের হোটেল ছেড়ে আমরা বাসে রওনা হব আঙ্কারার উদ্দেশে। দূরত্ব সাড়ে চার’শ কিলোমিটার। যদিও খুব সুন্দর হাইওয়ে, কিন্তু ঘন্টায় ৯০ কিলোমিটার বেগে ছুটলেও পাঁচ ঘন্টা তো লাগবেই। তা ছাড়া মাঝে মাঝে বিরতিও দরকার, - খাওয়া দাওয়া, বাথরুম ইত্যাদির জন্য।

ব্রেকফাস্ট সেরে বাসে উঠতে উঠতে প্রায় ন’টা বেজে গেল। আমরা অনেকেই গাইডদের পরামর্শ অনুযায়ী আটটায় তৈরি হয়ে গিয়েছিলাম।  কিন্তু সব দলেই কিছু লোক থাকে যারা কখনই সময় মেনে চলে না। শুধু তাই নয়, দেরির জন্য দুঃখ প্রকাশ তো দূরের কথা, ভাল সীট খালি নেই বলে মেজাজ দেখাতেও ছাড়ে না। কিছু করার নেই। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলাই হল জীবনযাত্রার মন্ত্র।

অপূর্ব ছয়-লেনের হাইওয়ে। আমাদের বাস ছুটে চলেছে এক’শ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টার গতিতে। তুরস্ক যে কতটা শিল্পোন্নত তার উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে রাস্তার দু-ধারে। অসংখ্য কারখানা। একটার পর একটা। আর সব ক’টি ঝকঝকে তকতকে। তুরস্কের ইস্পাত, মোটর গাড়ি বা অটোমোবাইল, জাহাজ নির্মান সবই খুব উন্নত মানের। অস্কার জানালো তুরস্কে নির্মিত গাড়ির শতকরা ৮০ ভাগ রপ্তানী হয়।

আমাদের আঙ্কারা পৌঁছতে বিকেল ৪টে হয়ে গেল। মাঝখানে একটি ছোট্ট শহরে লাঞ্চ সারা হল অত্যন্ত উৎকৃষ্ট কাবাব ও রুটি সহযোগে। তুর্কী কাবাব এক কথায় লা-জওয়াব।

হোটেল পৌঁছে সেই সন্ধ্যাটা দল বেধে খাওয়া দাওয়া আড্ডা মেরেই কেটে গেল। কোথাও আর বেরনো হল না, বাসের ড্রাইভারও খুব ক্লান্ত। বিশ্রাম দরকার। সুরজিৎ এসে জানিয়ে গেল আমরা যেন সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে তৈরি হয়ে নি। পরের দিন আঙ্কারা শহরের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। আর দেখা হবে আধুনিক তুরস্কের জনক মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের সঙ্গে।

আতাতুর্ক
চতুর্থ দিন। গত রাতে তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়ায় সকালে সবাইকে খুব তরতাজা দেখাচ্ছিল। যথারীতি কয়েক জন বিশিষ্ট লেট-লতিফের কৃপায় বেরোতে বেরোতে সোয়া ন’টা হয়ে গেল।

প্রথম গন্তব্য স্থান মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের  সমাধিসৌধ। মুস্তাফা কামাল আধুনিক প্রজাতন্ত্রী তুরস্কের জনক। ১৯২৩ খৃষ্টাব্দে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর তিনি দেশে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করেন ও প্রথম রাষ্ট্রপতি বা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত, আমৃত্যু তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর শাসন কালে তিনি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে আমূল পরিবর্তন আনেন। প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়, - যার ফলে দেশে শিক্ষিতের সংখ্যা দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে। নারী পুরুষের বিভেদ দূর করে, নারীদের পূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার দেওয়া হয়, - ফলস্বরূপ তুরস্কের মেয়েদের সব ক্ষেত্রেই দেখা যায় পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে, এমন কি সামরিক বাহিনীতেও। তাঁর এই অভূতপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে “আতাতুর্ক” বা তুরস্কের জনক হিসেবে সম্মানিত করা হয়।

সমধিসৌধের পরিবেশ খুব শান্ত ও গম্ভীর। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কৃষ্ণ বর্ণ অথবা শ্বেত শুভ্র পোষাকে পাহাড়ায় রত। পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে সবাই। চোখের পলক পর্যন্ত পড়েনা। ছবি তুললাম কিছু। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ দেখি একটা বাস এসে দাঁড়ালো। নেমে এলে দলে দলে ছাত্র ছাত্রীপ্রত্যেকের পরনে গ্র্যাজুয়েশন গাউন। সার বেঁধে দাঁড়ালো সবাই তারপর ধীর পদক্ষেপে ও নীরবে এগিয়ে গেল সৌধের দিকে। অস্কার জানালো এটি এখানকার একটি ঐতিহ্য। সদ্য স্নাতক বা গ্র্যাজুয়েটরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানের পর সোজা এখানে চলে আসেন আতাতুর্ককে সম্মান জানাতে।  সেদিন যারা গিয়েছিলেন তাঁরা সব সদ্য পাশ করা ডাক্তার অর্থাৎ মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট।

আতাতুর্ক এই সৌধেই সমাধিস্থ। নীরবে দর্শন করে বেরিয়ে এলাম আমরা।
 
 সমাধি সৌধের সামনে ছাত্ররা   সমাধির পাদদেশে পুষ্পস্তবক       অতন্দ্র প্রহরী

সমাধিসৌধের চত্ত্বরেই রয়েছে এক বিরাট সংগ্রহশালা। সেখানে তুরস্কের প্রাচীন ও আধুনিক ইতিহাসের প্রচুর সাক্ষী অতি যত্নে রক্ষিত। সীমিত সময়ের মধ্যে সব কিছু খুঁটিয়ে দেখা সম্ভব ছিলনা। তবে তুরস্কের ইতিহাস নিয়ে যদি কেউ গবেষণা করতে চান তবে এই সংগ্রহশালা একটি স্বর্ণখনি।

রাতের আহার সারলাম এক বিশেষ রেস্তোরাঁয়। স্থানীয় খাদ্যএর সঙ্গে কিছু বিনোদনের ব্যবস্থা ছিলসন্ধ্যেটা ভালই কাটল।

পাতাল নগরী
পঞ্চম দিন সকালে আবার তল্পি তল্পা গুটিয়ে রওনা হলাম। আবার খুব লম্বা সফর। প্রায় তিন’শ কিলো মিটার; অন্ততঃ ঘন্টা চারেক তো লাগবেই। গন্তব্য স্থান ক্যাপাডসিয়া, তুর্কী উচ্চারণে কাপাদকিয়া। আমাদের গাইড অস্কার ও সুরজিৎ দু-জনেই উচ্চারণ করল ক্যাপাডসিয়া। তাই আমিও তাই বলছি।

বিস্তৃত অঞ্চল। পর্যটকদের প্রিয় জায়গা। নামটা শুনেই মনে হয় এই অঞ্চলে এক কালে গ্রীক সভ্যতার প্রভাব ছিল। অস্কারকে জিজ্ঞেস করাতে জানালো শুধু এই অঞ্চলই নয়, তুরস্কের বহু জায়গায় গ্রীক ও তার পূর্ববর্তী রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাবও রয়েছে।

ক্যাপাডসিয়া অঞ্চলের এক বিশেষ আকর্ষণ বিশাল পাহাড়ি অঞ্চলের নীচে এক বিশাল ভূগর্ভস্থ শহর। মাটির নীচে অসংখ্য ঘর বাড়ি ও রাস্তা ঘাট। এই শহরের গোড়াপত্তন হয় রোমান অঞ্চলে। তখন খৃষ্ট ধর্মের শৈশবরোমান সম্রাটদের রোষে বহু খৃষ্ট ধর্মালম্বী পালিয়ে গিয়ে এই ভূগর্ভস্থ গহ্বরে লুকিয়ে থাকতেন। ধীরে ধীরে এখানে এক গোপন শহর গড়ে ওঠে। পরে রোমান সাম্রাজ্যের শক্তিক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শহরের বাসিন্দারা ওপরে উঠে আসেন এবং ভূতলেও এই শহরের বিস্তার ঘটে। এক আশ্চর্য জায়গা এই ভূগর্ভস্থ শহর। এটা যে কেন সপ্তম আশ্চর্যের অন্তর্ভুক্ত নয় কে জানে। এখনও সেই শহর অটুট, যদিও পরিত্যক্ত। এত রাজনৈতিক পালাবদলের পরেও এখনও নিখুঁত রয়েছে এই আশ্চর্য শহর।

এমন আকর্ষনীয় জায়গা; ঘুরে দেখতে কেটে গেল সারা দিন। গাইডের তাড়া খেয়েও কেঊ নড়ল না ওখান থেকে।


 
               পাথর কেটে শহর                       এই শহর মাটির তলায় বিস্তৃত

উষ্ণ প্রস্রবন
ষষ্ঠ দিনের সকালে মনে হল সবাই যেন খুব ক্লান্ত। আগের দিন প্রচুর হাঁটা হয়েছে। আমাদের দলের সবাই প্রবীন নাগরিক। হাঁটু, কোমর বহু ব্যবহারে জীর্ণ। ব্রেকফাস্ট টেবিলে সকলে একমত হল যে এ দেশে আসা উচিৎ ছিল কুড়ি বছর আগে, যখন শরীরে কিছু জোর ছিল।

আমাদের সম্মিলিত মতামত গাইডদের জানানো হল নেহাৎই ঠাট্টার ছলে। গাইডদ্বয় গম্ভীর মুখে আমাদের বক্তব্য শুনে নীচু গলায় নিজেদের মধ্যে কিছু একটা আলোচনা করে নিল। কিছুক্ষণ পরে জানালো আমাদের নিয়ে যাওয়া হবে এমন এক আকর্ষণীয় জায়গায় যেখানে সারাটা দিন খুব উপভোগ করব স্রেফ বিশ্রামের মাধ্যমে। জায়গাটির নাম পামুক্কলে। অস্কার জানালো তুর্কী শব্দ পামুক্কলের অর্থ কটন কাসল।

কেন এই নাম সেটা বুঝতে পারলাম একটু পরেই। জায়গাটি হট স্প্রিং বা উষ্ণ প্রস্রবণের জন্য পর্যটকদের অত্যন্ত প্রিয় জায়গা। ভূগর্ভ থেকে উৎক্ষিপ্ত উষ্ণ জল বয়ে চলেছে অবিরাম। সেই জলস্রোতের সঙ্গে মিশ্রিত নানা রকম খনিজ পদার্থ মাটির ওপর কয়েক হাজার বছর ধরে স্তরে স্তরে জমে উঠেছে। এখন মাটির ওপর সাদা রঙে ঢেউ খেলানো সেই স্তর বা প্রলেপন দূর থেকে বিশাল তুলোর পাঁজার মত মনে হয়। তাই এই অঞ্চলের নাম পামুক্কলে বা কটন কাসল। সে এক অভূতপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। মানতেই হবে যে প্রকৃতিই জগতের সবচেয়ে বড় শিল্পী।

হট স্প্রিং বা প্রস্রবণের জলের ধারাকে সিমেন্টের বেড়াজালে বেঁধে রাখা হয়েছে, অনেকটা বহমান সুইমিং পুলের মত। সেখানে গা ডুবিয়ে বসে ছিলেন অসংখ্য নারী পুরুষ। আমাদের পক্ষে সেটা সম্ভব ছিল না কারণ আমরা তৈরি ছিলাম না। আগে জানা থাকলে সাঁতারের পোষাক নিয়ে আসতাম। যাই হোক, সেই অবস্থাতেই প্যান্ট গুটিয়ে বসে রইলাম হাঁটু অব্দি পা ডুবিয়ে। আঃ সে কি স্বর্গীয় অনুভূতি।

 
                      কটন কাসল                           উষ্ণ জলে গা ডুবিয়ে

এই অঞ্চলের আশেপাশে রয়েছে রোমান সভ্যতার প্রচুর নিদর্শন। সবই প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত। ইদানীং তুরস্ক সরকারের প্রত্নতাত্মিক বিশেষজ্ঞরা এই ঐতিহাসিক স্থানটির হৃত গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। ষাটের দশকে পর্যটকদের ভীড় দেখে এখানে বেশ কয়েকটি বড় হোটেল তৈরি হয়। হোটেলের মালিকরা এই উষ্ণ জলপ্রবাহের গতি পরিবর্তন করে হোটেলের সুইমিং পুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারেন যে তাতে এখানকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সরকারী আদেশে সব হোটেল ভেঙে দেওয়া হয়।

কুসাদাসি
সপ্তম দিন। আমাদের তুরস্ক ভ্রমণ শেষ পর্যায়ে। আমরা এসে পৌঁছলাম কুসাদাসি, সমুদ্রের উপকুলে ছবির মত এক সুন্দর শহর। এর বীচ বা সমুদ্র সৈকত খুব জনপ্রিয়। আমরা গাইডের মুখে শুনে অবাক হলাম যে এই শহরর জনসংখ্যা মোটে ৬৫ হাজার। কিন্তু গ্রীষ্মকালে টুরিস্টদের ভীড়ে এই সংখ্যা ৫ লক্ষতে গিয়ে দাঁড়ায়। অসংখ্য হোটেল, যা নাকি সারা বছর খালি পড়ে থাকে, কিন্তু টুরিস্ট মরশুমে তিল ধারণের জায়গা থাকে না।

বিশাল এক বন্দর এই শহরের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। এখান থেকে ছাড়ে নানা রকম বাণিজ্যিক ও যাত্রী জাহাজ। এখন থেকেই শুরু হল আমাদের বেরানোর দ্বিতীয় পর্ব। সমুদ্র ভ্রমণ। ক্রুজ শিপে বিভিন্ন গ্রীক দ্বীপ ছুঁয়ে শেষে এথেন্স।

 
কুসাদাসি বন্দর

আমার এই কাহিনী তুরস্কেই সীমাবব্ধ থাক। গ্রীসের গল্প না হয় আরের দিন হবে। সংক্ষিপ্ত এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় এইটুকুই বলতে পারি যে এক সপ্তাহের মধ্যে তুরস্কের মত ঐতিহাসিক দেশে ঘোরা বা দেশটিকে জানা সম্ভব নয়। যেমন সম্ভব নয় স্বল্প সময়ে আমাদের দেশের হৃদয়কে স্পর্শ করা। তবে যা পেয়েছি তাতে আমি নিজে খুব তৃপ্ত ও নিজেকে যথেষ্ট ভাগ্যবান বলে মনে করি।


***************

Wednesday, 15 February 2017

অনশন

অবসর জীবন। অখন্ড অবসর। স্কুল বা কলেজের পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে বেশ আড্ডা জমে মাঝে মাঝে। নানা রকম গাল গল্প, রাজনীতি এবং অবশ্যই স্মৃতিচারণ। এই সব আড্ডা থেকেই হঠাৎ ভেসে ওঠে বিস্মৃত কোনও ঘটনা।

দিল্লী থেকে এক বন্ধু এসেছিল সম্প্রতি। সস্ত্রীক। একদিন সকাল থেকে রাত অব্দি কাটালো আমাদের সঙ্গে। প্রচুর হৈ হৈ আড্ডা হল সারা দিন ধরে। উস্কে দিয়ে গেল কিছু কলেজ স্মৃতি। তারই একটা গল্প শোনাবো ভাবছি। তবে এই কাহিনীর যাঁরা মুখ্য চরিত্র তারা সবাই সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই আসল নাম ধাম একটু গোপন রাখতে হচ্ছে।

রাজর্ষি দত্ত এই গল্পের নায়ক। নায়িকাও আছেন একজন; তাঁর কথায় পরে আসছি। এলাহাবাদের ছেলে রাজর্ষি। সেখানেই জন্ম, পড়াশোনা। মা বাবার একমাত্র সন্তান। বাবা শহরের খ্যাতিমান ডাক্তার। বাবার ইচ্ছে ছিল, ছেলে ডাক্তার হবে ও বাবার প্রতিষ্ঠিত প্র্যাকটিস সামলাবে। রাজর্ষি ছোটবেলা থেকেই খুব খামখেয়ালী। হায়ার সেকেন্ডারিতে খুব ভাল ফল করে ঘোষণা করল ডাক্তারি পড়বে না, কেমিস্ট্রি পড়বে। স্নেহশীল বাবা ও মা রাজি হলেন। যথাসময়ে কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে পাশ করল রাজর্ষি। এর পর মাথা গেল বিগড়ে। কেমিস্ট্রি ভাল লাগছে না, তাই এম এস সি আর পড়বে না। শখ হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার হবে। মা বাবা, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব সবাই বোঝানোর চেষ্টা করে বিফল হলেন।

বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে (বি এইচ ইউ) অ্যাপলাই করে, ইন্টারভিউ দিয়ে বেনারস ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হল রাজর্ষি; পাঁচ বছরের ইন্টিগ্রেটেড কোর্সে। আমরা তখন সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি। বিপুল উদ্যমে র‍্যাগিং চলছে। আমাদের সময়ে র‍্যাগিং ব্যাপারটা খুব মজার ছিল। আজকাল যে সব ভয়াবহ ঘটনা কাগজে পড়ি সেই সময় তা ছিল অকল্পনীয়।

সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র আমরা; সদ্য সদ্য সিনিয়র হয়েছি। র‍্যাগিং-এর উৎসাহ খুব বেশি। যথারীতি রাজর্ষিরও ডাক পড়ল। মাথা গোঁজ করে রাজর্ষি সব আবদার অত্যাচার মেনে নিল।  গান গাইল, গানের তালে তালে নাচল। কিন্তু এও জানাতে ভুলল না যে ও আমাদের থেকে সিনিয়র এবং ওর স্কুলের বেশ কয়েকজন সহপাঠী আমাদেরই কলেজে পড়ে, ফোর্থ ইয়ারে।  সেই সহপাঠীদের একজনের আবার মস্তান হিসেবে হিসেবে বেশ নাম ডাক ছিল। সব কিছু জেনে বুঝে আমরা রাজর্ষিকে আর বেশি ঘাটালাম না।

ধীরে ধীরে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল রাজর্ষির সঙ্গে। দেখলাম ছেলেটির নানা বিষয়ে বেশ জ্ঞান আছে, আর পড়াশোনাও করেছে প্রচুর। এদিনে আবার নাটক, ডিবেট ইত্যাদিতেও বেশ পারদর্শী। রাজনীতিতে খুব উৎসাহ। ছাত্র রাজনীতিতেও ঢুকে গেল। এক কথায় বেশ প্রতিষ্ঠিত করে নিল নিজেকে। কিন্তু খামখেয়ালী স্বভাবটা আমাদের নজর এড়ালো না। ক্লাসে যেতোনা প্রায়ই, ক্যান্টিনে বসে থাকত ঘন্টার পর ঘন্টা। মাঝে মাঝে ক্যাম্পাসের বাইরে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। চাল চলন অন্য সবার থেকে একটু আলাদা।

এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি থেকে রাজর্ষির কয়েক জন বন্ধু বি এইচ ইউ-তে এম এস সি পড়তে এসেছিল। তারা থাকত সাইন্স কলেজের হস্টেলে। রাজর্ষি প্রায়ই চলে যেত সেখানে আড্ডা মারতে। সেখানেই এক বন্ধুর মাধ্যমে উইমেন্স কলেজের কেমিস্ট্রির ছাত্রী কেতকী মল্লিকের সঙ্গে হঠাৎ একদিন আলাপ হয়ে গেল রাজর্ষির। আর প্রথম দর্শনেই প্রেম; কিন্তু এক তরফা, - রাজর্ষির দিক থেকে। থার্ড ইয়ার কেমিস্ট্রির ছাত্রী ফার্স্ট ইয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্রকে একেবারেই পাত্তা দিল না।

এবার নায়িকা সংবাদ।

কেতকী মল্লিক ঝাঁসীর মেয়ে। অনর্গল হিন্দীতে কথা বলত। নিজের নামটাও বলত হিন্দী উচ্চারণে, - কেৎকী মলিক। এমন সুন্দর নামটাকে বিকৃত করে যে কি সুখ কে জানে? কেউ কোনও দিন ওর মুখে বাঙলা শোনেনি। সাজ গোজের বালাই নেই। শ্যামলা রঙ কিন্তু বেশ কাটা কাটা, বুদ্ধি দীপ্ত চেহারা। ছিপছিপে আর বেশ লম্বা, শুনেছিলাম পাঁচ ফুট সাত কি আট। পরনে হাল্কা রঙের সালোয়ার কামিজ, সাইকেল চালিয়ে চলাফেরা করত। কোনও দিন রিক্সায় বা বাসে দেখিনি।

রাজর্ষি তো প্রথম দিন থেকেই ফিদা। কিন্তু ওর প্রাণের কেৎকী ফিরেও তাকায় না। এক দিন নাকি বলেই দিল, - বচ্চে হো, পঢ়াইমে ধ্যান দো।

দিন গড়ায়, মাস গড়ায়, বছরও গড়িয়ে চলল। আমরা এক দিন ফোর্থ ইয়ারে পৌঁছলাম। রাজর্ষি থার্ড ইয়ারে। কেতকীর এম এস সি ফাইনাল। এতদিনে রাজর্ষির সঙ্গে ভাল পরিচয় হয়ে গেছে কেতকীর; কিন্তু ঐ পর্যন্তই। কেতকী তত দিনে জেনে গেছে যে রাজর্ষি খুব একটা বাচ্চা নয়। কথাবার্তাও হয় দুজনে, - কিন্তু হিন্দীতে। উত্তর ও মধ্য ভারতের বাঙালিদের ঐ এক অভ্যাস। হিন্দীতেই বেশি স্বচ্ছন্দ।

রাজর্ষি হাল ছাড়েনা। কেতকীও পাত্তা দেয় না। এই এক তরফা প্রেম কাহিনী চাউড় হয়ে গেল ক্যাম্পাসে। রাজর্ষির কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই আর কেতকীও উদাসীন। এই ভাবেই চলছিল। আমরাও ধীরে ধীরে নানা কাজে ও অকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

এমন সময় ঘটল এক ঘটনা।

ছাত্র আন্দোলনে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠল। প্রায়ই স্ট্রাইক, মিছিল ইত্যাদি লেগে আছে। সাইন্স, আর্টস, কমার্স ও অ্যাগ্রিকালচার কলেজের ছেলেরা ভীষণ ভাবে আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। মেয়েরাও। কেতকীও নাকি খুব সক্রিয়। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্ররা একটু যেন নির্লিপ্ত। তার জন্য বেশ কিছু কটু মন্তব্যও শুনতে হচ্ছে এখানে সেখানে। এমন সময় হঠাৎ খবর এল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের রাজর্ষি দত্ত অন্যান্য কলেজের ছেলেদের সঙ্গে ভুখ হরতাল শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, রাজর্ষি না কি আমরণ অনশন করবে যদি কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের দাবী না মানেন।

শুরু হল এক নাটক। ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আলোচনায় বসলেন। বেশ কিছু দাবী মেনে নেওয়া হল। একে একে সব ছাত্রই ফলের রস খেয়ে অনশন ভাঙল। কিন্তু একজন অটল। সে হল রাজর্ষি। সব দাবী না মানলে সে অনশন ভাঙবে না। কর্তৃপক্ষ খুবই উদ্বিগ্ন। ঠিক ক’দিন অনশন চলেছিল এখন মনে পড়ছে না কিন্তু খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিল রাজর্ষি। খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন মা-বাবা এসে পৌঁছলেন এলাহাবাদ থেকে। কিন্তু রাজর্ষি অটল। একটা মাঝারি সাইজের হলে দুর্বল শরীর নিয়ে শুয়ে আছে রাজর্ষি। তাকে ঘিরে কিছু ছাত্র। মার কান্নাকাটি শুনেও রাজর্ষি অবিচল। বাবার মুখ থমথমে। ডাক্তার মানুষ। ছেলের পালস প্রেশার পরীক্ষা করে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।

শেষে রাজর্ষিরই এক বন্ধু একটু ইতস্ততঃ করে প্রস্তাবটা দিল, - কেতকীকে ডাকলে কেমন হয়! কেতকীর অনুরোধ হয়তো ফেলতে পারবে না। প্রস্তাবটা মনে ধরল সবার।  রাজর্ষির মা-বাবাকে কিছু জানানো হল না অবশ্য। কেতকী এল বান্ধবীদের সঙ্গে। কিন্তু বরফ গললো না। রাজর্ষি করুণ চোখে তাকিয়ে রইল কেতকীর দিকে। কিন্তু ওকে টলানো গেল না।

এবার এক চরম নাটক।

পরের দিন সকালে কেতকী আবার এল। একা। কাঁধে একটা ছোট্ট ব্যাগ আর হাতে একটা বোতল। মনে হল বোতলের ভেতর কমলা লেবুর রস আছে। বাইরে সাইকেল দাঁড় করিয়ে, হলে ঢুকল দৃপ্ত ভঙ্গীতে। ঢুকেই গম্ভীর গলায় আদেশ, - আপলোগ বহার জাইয়ে। সেই দৃঢ় ভঙ্গীর সামনে কারও কিছু বলার সাহস হল না। সবাই রাজর্ষিকে হলে একা রেখে বেরিয়ে এল চুপ চাপ। কেতকী ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করল। মিনিট দশেকের অপেক্ষা। বিরাট সাসপেন্স। কি হচ্ছে ভেতরে কে জানে। দরজা খুলল। আবার কেতকীর আদেশ সেই কঠোর কন্ঠে, - আপলোগ অন্দর আইয়ে। সবাই ভেতরে গিয়ে দেখে সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য। বোতলে মুখ লাগিয়ে ফলের রস খাচ্ছে রাজর্ষি আর জুল জুল চোখে তাকিয়ে আছে কেতকীর দিকে। সবাই হতবাক। কি এমন হল যে এমন নরম হয়ে গেল রাজর্ষি। উত্তরটা জানা গেল দু-দিন পরে। বোতলটা রাজর্ষির পাশে রেখে, ব্যাগ থেকে একটা রাখী বের করেছিল কেতকী, - তারপর হুমকি, - আভি পি লে নহী তো রাখী পেহনা দুঙ্গী। তাতেই কাজ হয়। দুর্বল হাতে বোতল খুলে চুক চুক করে কমলা লেবুর রস খেতে শুরু করে আমাদের গল্পের হিরো।

উপসংহার

এই কাহিনী এখানে শেষ হলেই ভাল হত। কিন্তু  ধৈর্য ধরে যাঁরা এই কাহিনী পড়বেন, তাঁদের আরও কিছু কথা জানানো দরকার। রাজর্ষি আর কেতকী দু-জনেই রিটায়ার করে এখন নয়ডার বাসিন্দা। রাজর্ষি সরকারি চাকরি করত দিল্লীতে। কেতকীও দিল্লীরই কোনও একটি কলেজে কেমিস্ট্রির অধ্যাপক ছিল। ওদের একমাত্র সন্তান পিতামহের আদর্শ অনুসরণ করে ডাক্তার হয়েছে। বিয়ে করেছে সহপাঠী এক পঞ্জাবী ছেলেকে। তাদের একটি ছেলেও আছে। মেয়ে, জামাই আর নাতি নয়ডাতেই থাকে, ওদের কাছেই। রাজর্ষি এখনও সেই রকম খামখেয়ালী, - মোবাইল ব্যবহার করে না। কেতকীর মোবাইল নাম্বার জোগাড় করেছি। কথাও হল একদিন।

আরও একটা কথা। ওরা আজকাল নিজেদের মধ্যে সব সময় বাঙলাতেই কথা বলে। খাঁটি, নির্ভুল ও নির্ভেজাল বাঙলা।

কলকাতা
১৫ই ফেব্রুয়ারী ২০১৭

Saturday, 11 February 2017

মডেলস একজিবিশন

প্রেমনাথ ভার্গব। আমরা ডাকতাম প্রেম। আমাদের সহপাঠী। মাঝারি হাইট। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। একটু দোহারা। পড়াশোনায় খারাপ নয় তবে আহামরিও কিছু নয়। ক্লাসের ফাঁকে ও ছুটির দিনগুলোতে লাইব্রেরিতে বসে থাকত আর নানা রকম বই ও ম্যাগাজিন পড়ত। টেক্সট বুকে খুব একটা আগ্রহ ছিল না।  পপুলার মেকানিক্স নামে একটি ম্যাগাজিন প্রেমের খুব প্রিয় ছিল। গোগ্রাসে গিলত সেটাকে। শুধু তাই নয়, - কিছু যদি পছন্দ হয়ে গেলে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলত।

প্রত্যেক বছর জানুয়ারী মাসে আমাদের কলেজে মডেলস একজিবিশন হত। সে এক এলাহী ব্যাপার। বড় বড় দুটো হল জুড়ে নানা রকম মডেল, - উৎসাহী ছাত্রদের ভীড়। উদ্বোধন করতেন স্বয়ং প্রিন্সিপাল, সঙ্গে সব রাশভারী প্রফেসরেরা। তাঁদের ইম্প্রেস করতে ছাত্রদের মধ্যে বেশ একটা রেষারেষি। তৃতীয় দিনে আসতেন ভাইস চ্যান্সেলর ও অন্যান্য ভিআইপিরা। ঐ একই দিনে এক ঝাঁক পায়রার মত হাজির হত উইমেন্স কলেজের ছাত্রীরা; বেশ সেজেগুজেই আসত। যাক গে, সে এক অন্য কাহিনী।

আমাদের সময় ১১ বছরের হায়ার সেকেন্ডারির পর পাঁচ বছরের ইন্টিগ্রেটেড কোর্স ছিল। প্রথম দু-বছর র্যা গিং ট্যাগিং সামলে থার্ড ইয়ারে একটু ধাতস্থ হয়ে বসেছি। এমন সময় প্রেমের মাথায় ভূত চাপল। সে ক্ষেপে উঠল এবার আমাদেরও মডেল বানাতে হবে। কি বানাবে তাও ঠিক করে ফেলেছে। এবার আমাদের শুধু সহযোগিতা করতে হবে। রাজি হতেই হল। এত উৎসাহ ওর; নিরাশ করতে মন চাইল না।

কোনও একটা টেকনিকাল ম্যাগাজিন থেকে আইডিয়াটা পেয়েছে প্রেমনাথ। মডেলের নাম – অটোমেটিক কয়েন সর্টিং মেশিন। একটা ছোট সাইজের ড্রাম বা সিলিন্ডার ঘিরে একটা একটা হেলিক্যাল-শেপড স্লাইড; তার ওপর বিভিন্ন সাইজের খাঁজ কাটা। সিলিন্ডারের ওপরে একটা ফানেল; সেই ফানেলে নানা সাইজের কয়েন ঢোকানো হবে। ভেতরে একটা মোটর বসানো। সুইচ টিপে মোটর চালু করলে সিলিন্ডারে একটা কম্পন বা ভাইব্রেশন হবে। ফানেলের ভেতর রকমারি কয়েন ছেড়ে দিলে, ভাইব্রেশনে স্লাইড বেয়ে কয়েন গুলো নীচে নামবে ও খাঁজের মাপ অনুযায়ী নীচে নানা মাপের কৌটোতে জমা হবে। আহা মরি কিছু নয় কিন্তু আশ্চর্য, জিনিসটা বেশ কাজ করল। প্রেমকে বাহবা দিতেই হল। একবার কাজ শুরু করতেই সবারই উৎসাহ ছিল দেখার মত। সেই সময় একটা মান্ধাতা আমলের ক্যামেরা দিয়ে একটা ছবিও তোলা হয়েছিল। কিন্ত অর্দ্ধ শতাব্দী পর সেই ছবি আর খুঁজে পাইনি। ছবিটা দিলে মোটামুটি বোঝানো যেত জিনিসটা কি।

একজিবিশনের প্রথম দিনই দেখা গেল, আমাদের স্টলের সামনে বেশ ভীড়। লোকে বেশ আগ্রহ নিয়ে আমাদের মডেল দেখছে। বেশ একটু আশা হল; হয়তো একটা প্রাইজ পেয়েও যেতে পারি। ফার্স্ট, সেকেন্ড ও থার্ড প্রাইজ ছাড়াও অনেক কনসোলেশন প্রাইজও ছিল।

কিন্তু সব চেয়ে বেশি ভীড় দেখলাম আমাদের এক বছরের সিনিয়র একটি গ্রুপের স্টলে। সেই গ্রুপের নেতা সুবোধ নিগম বলে একটি ছেলে। ওরা বানিয়েছে পোস্টকার্ড ডিস্পেনসিং মেশিন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় সেটি একটি অভূতপূর্ব উদ্ভাবন। মানতেই হল। এরা প্রাইজ পাবেই। অপূর্ব কাজ করছে সুবোধের মেশিন। সবাই মেশিনে পয়সা ঢুকিয়ে পোস্টকার্ড কিনছে। কিন্তু সুবোধের মুখ চোখ থমথমে। কেন বোঝা গেল না।

যথা সময় পুরস্কার ঘোষণা করলেন কর্তৃপক্ষ। আমাদের মডেল থার্ড প্রাইজ পেয়েছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাল্টিলেভেল ফ্লাইওভার পেয়েছে সেকেন্ড প্রাইজ। প্রচুর সান্ত্বনা পুরস্কার। আর যা ভেবেছিলাম আমরা সবাই, - সুবোধের মডেল ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছে। সুবোধের মুখ তখনো গম্ভীর, যেন কেঁদেই ফেলবে।

ব্যাপারটা বোঝা গেল পরের দিন।

সেই সময় পোস্টকার্ডের দাম ছিল পাঁচ পয়সা। সুবোধের মেশিনে পাঁচ পয়সার মাপের একটি খাঁজ বা স্লট কাটা ছিল। সেটাতে একটি মুদ্রা ঢোকালে, দু সেকেন্ডের মধ্যে একটা পোস্টকার্ড বেরিয়ে আসত। দিব্যি চলছিল। কাল হল একজিবিশন শুরু হওয়ার তিন দিন আগের একটি ঘোষণা। ভারতীয় ডাক ও তার বিভাগ পোস্টকার্ডের দাম পাঁচ থেকে বাড়িয়ে ছ-পয়সা করে দিলেন। বাধ্য হয়ে সুবোধদের গ্রুপকে একজিবিশনের আগের দিন পোস্ট অফিস থেকে ছ-পয়সা দামের পোস্টকার্ড কিনে আনতে হল। নিয়ম অনুযায়ী মেশিন চালু রাখতেই হয়েছিল। জনসাধারণ পাঁচ পয়সা দিয়ে ছ-পয়সার পোস্ট কার্ড নিয়ে চলে গেছে।

কলকাতা
১১ই ফেব্রুয়ারি ২০১৭

Sunday, 25 December 2016

ফ্লুরি’স

এবার ক্রিসমাস বা বড়দিন পড়েছে রবিবারে। বিভিন্ন রবিবাসরীয়তে বড়দিনের মাহাত্ম্য ও পরম্পরা নিয়ে নানা রকম লেখা খুব উৎসাহ নিয়ে পড়লাম। অনেক অজানা তথ্য সামনে এল। আর জানতে পারলাম রঙীন পার্ক স্ট্রীটের বর্ণময় ইতিহাস। পার্ক স্ট্রীটের বড়দিন উৎসব কলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

আমার ছোটবেলা কেটেছে বাঙলার বাইরে। পার্ক স্ট্রীট নিয়ে কোনও বাল্যস্মৃতি আমার নেই। যা আছে তা কৈশোর আর যৌবনের সন্ধিক্ষণের। স্কুলের পাট চুকিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম কলেজে ভর্তি হতে। খুব সখ ছিল কলকাতায় কলেজে পড়ব। ভর্তি হলাম সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। কলেজের হস্টেলে জায়গা হলনা। নাম লেখালাম অক্সফোর্ড মিশন হস্টেলে। বিধান সরণি ও বিবেকানন্দ রোডের মোড়ে। এখনও আছে, - তবে নাম পালটে হয়েছে ওয়াই এম সি এ।

মোড়ের মাথয় ২বি বাসে উঠে নেমে যেতাম পার্ক স্ট্রীট – চৌরঙ্গী রোডের মোড়ে। ভাড়া ছিল ২০ পয়সা। দান্ডিযাত্রারত গান্ধিজি তখন সেখানেই অবস্থান করতেন। পরে পাতাল রেল প্রকল্পের জন্য সেখান থকে অপসারিত হন।

পার্ক স্ট্রীট দিয়ে কোনও বাস চলত না। মোড় থেকে হেঁটে কলেজে পৌঁছতে মিনিট দশেক লেগে যেত। প্রথম দিকে যখন হেঁটে যেতাম, হাঁ করে দেখতাম চারদিক। সে এক স্বপ্ন রাজ্য। ঝকঝকে দোকান পাট, হোটেল আর রেস্তোঁরা। যত দূর মনে আছে, আমাদের ক্লাস শুরু হত সকাল দশটা নাগাদ। সেই সময় দোকান পাট সবে খুলছে, ক্রেতার সংখ্যা খুব কম। তবে একটি রেস্তোঁরা গমগম করত। নাম ফ্লুরি’স। অবাক হয়ে ভাবতাম সকাল বেলায় এত ভীড় কেন? কলকাতাবাসী কিছু সহপাঠীর কল্যাণে জানলাম এখানকার ব্রেকফাস্ট নাকি বিখ্যাত। সারা ভারতের এমন কি বিদেশের লোকরাও নাকি সেখানে প্রাতঃরাশ করতে আসেন। কে আসেন নি সেখানে? বড় বড় চিত্রতারকা, সঙ্গীত শিল্পী, ক্রিকেটার- রাজ কপূর, দিলীপ কুমার, কিশোর কুমার, পাতৌদির নবাব, শর্মিলা ঠাকুর, জয়সীমা। হাঁ করে শুনতাম আর জুলজুল করে দেখতাম কাচের বাইরে থেকে ভেতরের দৃশ্য। একটা চাপা স্বপ্ন বোধহয় জেগেও উঠেছিল, - যে একদিন এখানে আমিও ব্রেকফাস্ট করব।

সেন্ট জেভিয়ার্সের পড়াশোনা শেষ হল। কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। পার্ক স্ট্রীট ও ফ্লুরিসের স্মৃতি ম্লান হয়ে গেল ধীরে ধীরে। চাকরীও পেলাম একদিন; আবার বাঙলার বাইরে।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় বোধহয় তখন। কলকাতায় এসেছি ছুটি কাটাতে। মা বাবা তখন কলকাতাবাসী। মুক্তি পেল সত্যজিৎ রায়ের জন অরণ্য। শংকরের উপন্যাস পড়া ছিল আগেই। খুব আগ্রহ নিয়ে দেখলাম ছবিটি। একটি দৃশ্যে রবি ঘোষ, প্রদীপ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে এসেছেন ফ্লুরিসে। অর্ডার দিয়েছেন চিকেন অমলেট। পুরনো স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। মনে হল তাই তো এখানে তো আমার ব্রেকফাস্ট করার স্বপ্ন ছিল। না সেবারও সম্ভব হয়নি।

সুযোগ এল বহু বছর পর। ছেলেমেয়ে বড় হয়ে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত। ছেলে কলকাতায় এসেছে সবার সঙ্গে দেখা করতে। বিদেশে জন্ম ও মানুষ। একদিন জিজ্ঞেস করে বসল, বাবা এখানে নাকি ফ্লুরিস নামে একটা খুব ভাল রেস্তোঁরা আছে, - খুব ভাল ব্রাঞ্চ পাওয়া যায়? আমার কলকাতার বন্ধুরা বলেছে।

গেলাম অবশেষে। সপরিবারে। ঢুকলাম। চারিদিক দেখলাম ভাল করে। ভেতর থেকে এই প্রথম দর্শন। খেলাম সেই ব্রেকফাস্ট। বেশ ভালই। কিন্তু সেই থ্রীল বা সেই শিহরণ অনুভব করলাম না তো। এত দিনের স্বপ্নপূরণের তৃপ্তি? আসলে কৈশোরের সেই মনটা হারিয়ে গেছে কবে টেরই পাইনি।

কলকাতা – বড়দিন ২০১৬

Thursday, 24 November 2016

মুদ্রা রাক্ষস – ২০১৬

বেশ কয়েক বছর ধরে কার্ড ব্যবহারে অভ্যস্ত আমি। মাসের প্রথমেই যে কোনও এটিএম থেকে টাকা তুলে নিই। বেশির ভাগ সময়েই ১০০০ বা ৫০০ টাকের নোট বেরোয় মেশিন থেকে। আগে বড় মাপের কেনা কাটা কার্ডেই সারতাম। কিন্তু তাতে প্রায়ই খুচরোর আকাল দেখা যেত। ছোট খাট কেনা কাটা , কলাটা, মুলোটা বা হকারের কাছে সেফটি পিন বা পায়জামার দড়ি কিনতে গেলে অসুবিধে হত। তাই মাস চারেক আগে এক গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হল; - এখন থেকে সব কেনাকাটা নগদেই সারতে হবে। সুযোগ মত ৫০০ ও ১০০০টাকার নোট ভাঙিয়ে নিতে হবে। তাতে হাতেনাতে ফল মিলল। রাতারাতি খুচরোর সমস্যা মিটে গেল।

৮ই নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক ঘোষণার পর যখন আমার পরিচিত মহলে সবাই ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট গুনতে ব্যস্ত, তখন আমি ও আমার গিন্নীর জিম্মায় ৪০টি কড়কড়ে ১০০ টাকার নোট, কিছু ৫০, একটি ২০ ও গোটা পনের ১০ টাকা। একটিও ১০০০ বা ৫০০ নেই। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হল না।

পরের দিন ভোরবেলা কাকার ফোন। বৃদ্ধ কাকা ও কাকীমা থাকেন সল্ট লেকে। নিঃসন্তান। কাকীমা বেশ কয়েক বছর ধরে শয্যাশায়ী। বহুদিনের এক বিশ্বস্ত পরিচারিকা ও তার পরিবার বাড়িতে থেকেই দেখাশোনা করে। আমি ফোনে খোঁজ নিই প্রত্যেক দিন। মাঝে মাঝে গিয়ে দেখা করে আসি।  কাকা খুব খুশি হন। সবার খোঁজ খবর নেন। কুশল জিজ্ঞাসা করেন। নিজের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। পরামর্শ চান। আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি রাখেন না। কাকীমার ঘরেও বসি কিছুক্ষণ। কথাবার্তা বিশেষ হয় না। স্নেহশীলা কাকীমা এখন সম্পূর্ণ স্মৃতিলুপ্তা।

তুই এক্ষুনি চলে আয়, খুব দরকার, - কাকার কন্ঠস্বরে মনে হল কোনও বিশেষ বিপদে পড়েছেন। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে পৌঁছে গেলাম সল্ট লেক। ভোর বেলা রাস্তায় ভীড় কম, বিশেষ সময় লাগল না। দরজায় বেল বাজাতেই কাকা নিজেই দরজা খুললেন। চোখে মুখে বিরাট উদ্বেগের ছাপ। আমায় দেখে কোন আপ্যায়নের চেষ্টা করলেন না, দরজা খুলে রেখেই চলে গেলেন ভেতরে।

ফিরে এলেন এক বিরাট মোটা খাম নিয়ে। কোনও রকম ভূমিকা ছাড়াই, সেই খাম আমার হাতে দিয়ে বললেন, - এই টাকাটা তুই পালটে দে; আমার পক্ষে ব্যাঙ্কে লাইন দেওয়া সম্ভব নয়। খামের ভেতর সব কড়কড়ে হাজার টাকার নোট। বের করে গুনে আমি তো স্তম্ভিত, - এত নগদ টাকা কেউ বাড়িতে রাখে?

কাকা হতাশ মুখে জানালেন, - কি করব বল্‌? তোর কাকীমার তো এই অবস্থা! আমিও খুব একটা সুস্থ নই। হঠাৎ ডাক্তার বা হাসপাতালের দরকার হলে কি করব? আর তুই তো জানিস আমার কোনও কার্ড নেই, আমি ভাল চোখেও দেখিনা। তাই কিছু টাকা ঘরে রাখি।
বুঝলাম। এই বিরাট অঙ্কের টাকা ব্যাঙ্কে গিয়ে আমাকেই পাল্টাতেই হবে। কাকা জানালেন কোনও তাড়া নেই। দু-সপ্তাহের সংসারের খরচ আলাদা করে তোলা আছে ছোট নোটে। অসুবিধে হবে না।

আমার ব্যক্তিগত সঞ্চয় এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে গচ্ছিত। সেখানে গিয়ে দেখি বিরাট লাইন। কোলাপসিবল গেটের সামনে এক বিশাল বপু দারোয়ান। গুনে গুনে লোক ঢোকাচ্ছে। ব্যাঙ্কের কর্মচারীদের মধ্যে একজন বিশেষ পরিচিত ভদ্রলোকের মোবাইলে ফোন করলাম। ধরলেন না।

আমাদের আবাসনের কাছে একটি বেসরকারী ব্যাঙ্কেও আমার কিছু লেনদেন হয়। সেখানেও ভীড়। ফোন করলাম। পরিচিত একটি মেয়ে জানাল, - এখন আসবেন না স্যার। এখানে যুদ্ধ চলছে। ক’টা দিন ধৈর্য ধরুন। ভীড় একটু হাল্কা হলে আমি নিজেই আপনাকে ফোন করব।

বাঙালী সমাজে উপদেষ্টার অভাব হয় না কখনও। আমার সমস্যার কথা শুনে আঁতকে উঠলেন এক প্রতিবেশী, - ক্ষেপেছেন নাকি মশাই। এত টাকা জমা দিলে ইনকাম ট্যাক্স থেকে ধরবে আপনাকে।

তা কেন? আমি প্রতিবাদ জানাই। আড়াই লাখ পর্যন্ত কোনও ভয় নেই। আমার কাছে তো সেই তুলনায় অনেক কম টাকা।

আরে ছাড়ুন মশাই। গভার্নমেন্টের কিছু ঠিক আছে? এখন বলছে আড়াই লাখ। পরে দেখবেন এক লাখ বা পঞ্চাশ হাজার যারা দিয়েছে, তাদের এসে ধরছে। তার পরেই তিনি মোক্ষম বাণীটি ছাড়লেন, - আমার শালার বন্ধুর ভায়রা ভাইয়ের ভাগ্নে একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, ইনকাম ট্যাক্স কনসালটেন্ট, খুব নাম করা, - ও বলেছে।

শুনে পিছিয়ে গেলাম। ওষুধের দোকানে পুরনো নোট নিচ্ছে শুনে চার মাসের ওষুধ কিনে ফেললাম। আমরা দু-জনই স্বাস্থ্যরক্ষার্থে একটু ওষুধ পত্রের ওপর নির্ভরশীল। পেট্রল পাম্পেও চলছে ৫০০ ও হাজার; গাড়ির ট্যাঙ্ক ফুল করে ফেললাম। কিছুটা কমল।

আমাদের আবাসনের কাছে বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্ক। একদিন দেখলাম তার একটির সামনে ছোট্ট লাইন, তাতে দু চারটি পরিচিত মুখ।  খোঁজ করে জানলাম ৪০০০ টাকা অব্দি পুরনো নোট পালটে দিচ্ছে। তবে পরিচয় পত্র লাগবে। তড়িঘড়ি বাড়ি গিয়ে আধার কার্ড ও তার  কপি নিয়ে এলাম। যা দিনকাল পড়েছে, প্যান কার্ড, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, - সব কিছুর কপি বাড়িতে রাখি। মিনিট চল্লিশেক লাইনে দাঁড়ানোর পর যখন কাউন্টারের সামনে দাঁড়ালাম, - শুনলাম ১০০ টাকার নোট নিঃশেষ। ২০ টাকার দুটো বান্ডিল নিতে হল। একটার আবার সীল ছেঁড়া। মৃদু প্রতিবাদ জানাতে কাউন্টার কর্মী ব্যাজার মুখে বললেন, - গুনে নিন। পেছনে লম্বা লাইন দেখে সাহস হল না। সবার চোখমুখের যা অবস্থা এখানে টাকা গুনতে বসলে আমার জ্যান্ত সমাধিস্থ হবার সম্ভাবনা প্রবল। মানে মানে বাড়ি ফিরলাম। না গুনি নি। যদি দেখি কম আছে তবে মনটা বড় খারাপ হয়ে যাবে। ঐ যে বলে না, - ইগনোরেন্স ইজ ব্লিস।

এদিকে বাজার হাট করে আমারও রেস্ত ফুরিয়ে আসছে। মাছ, তরি-তরকারি, চাল, ডাল, ময়দা ইত্যাদি স্পেন্সার, বিগ বাজার ইত্যাদি আধুনিক বিপনিতে কার্ড ব্যবহার করে কাজ সারলাম ক’দিন। তবে ধোপা, খবরের কাগজ, পাউরুটি, ইত্যাদি ছোটখাটো বাজারের জন্য তো পকেটে হাত দিয়েই হয়। এক কাঁদি কলা কিনতে তো আর কার্ড ব্যবহার করা যায় না। তা ছাড়া আরও এক কান্ড হল। কাজের মেয়েটি একদিন ঘোষনা করলেন, - আগামী কাল কাজে আসতে দেরি হবে। কেন না, একজন দেখা করতে বলেছে, - ৫০০ টাকার নোট দিলে ৪টে ১০০ টাকার নোট দেবে। আমি ফতোয়া জারি করলাম, - কভি নেহি। আমি ভাঙিয়ে দেব। দিলাম। ফলে আরও দুটি ৫০০ টাকার নোট পকেটে ঢুকল। ‘অধিকন্তু ন দোষায়’ কথাটা কিন্তু সব সময় খাটে না।

অবশেষে ফোন এল, সেই বেসরকারী ব্যাঙ্ক থেকে। আমায় পরের দিন সন্ধ্যে ছটায় ব্যাঙ্কে যেতে বলা হল, - যখন ভীড় কমে আসবে। পরামর্শ মত গেলাম চেক বই পকেটে নিয়ে। পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকানো হল, গোপনে। সামনের দিকে তখনও খুব ভীড়। মনে হচ্ছিল যেন কোনও বেআইনি কাজ করতে ব্যাঙ্কে ঢুকছি। শুনলাম প্রবীণ নাগরিকদের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা।

অবশেষে কাকার অবশিষ্ট সম্পদ জমা হল আমার নামে। এবার সেই টাকা তুলে ফেরত দিতে হবে। সপ্তাহে ২৪ হাজারের বেশি তোলা যাবে না। ঠিক আছে কিস্তিতেই শোধ করা যাবে। কি আর করা। ব্যাঙ্ক কর্মী গোটা চারেক ২০০০ হাজার গছাতে চেয়েছিলেন। সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলাম। ঐ নোট কেউ নিচ্ছে না।

আবাসনের ভেতরেই একটি এটিএম। ৯ তারিখ থেকে বন্ধ। ভেতরে নিরাপত্তা কর্মী গভীর নিদ্রারত। একদিন সন্ধ্যায় মহা সোরগোল শুনে চমকে উঠলাম। জানলা দিয়ে দেখি আবালবৃদ্ধবনিতা রূদ্ধশ্বাসে ছুটছে। কি ব্যাপার? উত্তেজিত একজন জানালেন, - এটিএম খুলেছে। আমিও ছুটলাম। যা পাওয়া যায়। গিয়ে দেখি প্রায় কুড়িজন এর মধ্যেই লাইনে। বেশির ভাগই আমাদের আবাসিক। কিছু নিরাপত্তা রক্ষী ও গাড়ির চালকও আছেন। সব চেয়ে পেছনে আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক প্রতিবেশী ম্লান মুখ করে দাঁড়িয়ে। আমাকে লাইনে দাঁড়াতে দেখে একটু হাল্কা হেসে বললেন, - যাক আমি তবে আর লাস্ট নই। ভদ্রলোক খুবই উদ্বিগ্ন। বার্দ্ধক্য ও শারীরিক দুর্বলতা জনিত কারণে ব্যাঙ্কে যেতে পারেন নি, পকেট গড়ের মাঠ। এটিএম থেকে কিছু হাতে এলে কিছুটা সুরাহা হবে। বার বার জিজ্ঞেস করছেন এত লোক লাইনে দাঁড়িয়েছে, টাকা শেষ হয়ে যাবে না তো? বোঝালাম সেই সম্ভাবনা কম; এটিমে প্রচুর টাকা থাকে। আর মোটে ২০০০ করে তোলা যাচ্ছে। তা ছাড়া গুণে দেখা গেল ওনার সামনে ২৩ জন দাঁড়িয়ে। অতএব কোনও ভয় নেই। এক এক করে সবাই বেরিয়ে আসছে ২০ খানা করে কড়কড়ে ১০০ টাকার নোট নিয়ে। সবার মুখে কেমন যুদ্ধ জয়ের হাসি। এরই মধ্যে আবার আতঙ্ক; ১০০ টাকা শেষ হয়ে যদি ২০০০ টাকার নোট বেরোয়, তবে? ২০০০ টাকার নোট তো এখন খোলামকুচি। কেউ নেয় না। যাদের কাছে আছে, তারা নোট হাতে নিয়ে সেলফি তোলে আর ফেসবুকে পোস্ট করে। না, সে রকম কিছু ঘটল না। আমিও অবশেষে ২০ টা ১০০ টাকার নোট হাতে নিয়ে এটিএম বুথ থেকে বেরিয়ে এলাম।

বেরিয়ে দেখি সেই ভদ্রলোক, যিনি লাইনে আমার সামনে ছিলেন, - তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। মুখে সুখ ও তৃপ্তির হাসি। আমাকে দেখে বললেন, - এই টাকাগুলো হাতে পেয়ে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের এক সুখস্মৃতি অনুভব করছি, জানেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম, - সে আবার কোন স্মৃতি। উনি স্বপ্নালু চোখে বললেন, ঐ যে যখন প্রথম চাকরির প্রথম মাইনে হাতে পেয়েছিলাম!

সত্যিই। খুব খাঁটি কথা।

কলকাতা
২৫শে নভেম্বর ২০১৬

Thursday, 1 September 2016

শপিং - আমেরিকান স্টাইল

বেশ কয়েক মাস আমেরিকায় কাটিয়ে এলাম। মেয়ে-জামাই, ছেলে-বৌ আর অবশ্যই নাতি-নাত্নীদের সাহচর্যে। যাবার আগে কিছু ডলার নিয়ে গিয়েছিলাম, - যদি কখনও দরকার হয়। দিনকাল পাল্টেছে। বিদেশী মুদ্রা এখন খুব সহজলভ্য। মনে আছে ১৯৭৭ সালে একবার লন্ডন যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুসারে যা পেয়েছিলাম, তাতে কোনও রকমে ট্যাক্সি ভাড়াটা দেওয়া যায়। খরচ বাঁচাবার জন্য অচেনা জায়গায় টিউব রেলে হোটেলে পৌঁছেছিলাম। হোটেলের খরচাটা স্থানীয় অফিস থেকে দেওয়া হয়েছিল। ফাঁকা পকেট নিয়ে সেই আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা।

যাই হোক, এবার আমেরিকা যাত্রায় যা নিয়ে গিয়েছিলাম, পুরোটা খরচ হয়নি। ব্যাঙ্কে ফেরত দিয়েছি। যে দামে কিনেছিলাম তার থেকে কম দাম পেলাম। বিদেশী মু্দ্রার ব্যবসা এ ভাবেই চলে। নিজেদের জন্য বিশেষ কিছু কেনা হয়নি। কিই বা কিনব এই বয়সে। নাতি-নাত্নীদের আব্দার মেটাতে কিছু কেনা কাটা হয়েছে, ওদের মা-বাবাদের রক্তচক্ষু এড়িয়ে (ভীষণ আস্কারা দিচ্ছ ইত্যাদি)। এই ক্ষুদে গুলো যদি দাদু-দিদা/ঠাম্মার সঙ্গে আব্দার না করে তবে কার সঙ্গে করবে? ওদের আব্দার মেটানোটা এখন আমাদের এক বিশাল আনন্দের খোরাক।

দেশে ফেরার আগে একটা মলে গিয়ে কিছু কেনাকাটা হল। এক বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। নানা রকমের পণ্য। বাচ্চাদের ফ্রক, শার্ট, ইত্যাদি কেনা হল। এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে, হঠাৎ কিছু টি-শার্টের দিকে চোখ পড়ে গেল। নানা রকম রঙের ও মাপের। আমি আবার ঈশ্বরের কৃপায় একটু বিশাল বপু। আমার মাপের পছন্দ মত জামা কাপড় পাওয়া একটু দুষ্কর। কিন্তু ঐ দেশে শুধু বিশাল কেন, বিশালতর মানুষেরও অভাব নেই। আমার মাপের বেশ নানা রঙের ও কায়দার টি-শার্ট আছে দেখলাম। পছন্দ মত নিয়েই নিলাম খান দুয়েক। বিপণি-বালিকা জানালেন “সেল” চলছে, তাই প্রায় ২৫% ছাড়। মোবাইল ফোনের ক্যালকুটারে দাম গুলো ৬৮ দিয়ে গুণ করে দেখলাম, দেশের হিসেবেও বেশ সস্তাই পড়ছে।

যথা সময়ে দেশে ফিরে সব গুছিয়ে তুললাম আলমারিতে। দিন তিনেক আগে হঠাৎ খেয়াল হল, - তাই তো ওগুলো তো পরাই হচ্ছে না। বের করলাম একটি। কিন্তু পরতে গিয়ে দেখি, বেশ কুঁচকে আছে। ভাবলাম একটু ইস্তিরিটা বুলিয়ে দিই। ইস্তিরি গরম করে শার্টটা সযত্নে মেলে দিলাম ইস্তিরি টেবিলের ওপর। গলার কছে পিঠের দিকে লেবেলটা চোখে পড়ল, - এই প্রথম।

জ্বল জ্বল করছে ছোট্ট একটি লেখা,  - “মেড ইন ইন্ডিয়া”।

কলকাতা - ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০১৬